পশ্চিমবঙ্গের স্কুলের পাঠ্যক্রমে একাধিক পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে রাজ্যটির সিলেবাস পুনর্গঠন কমিটি। সাহিত্য, ইতিহাস ও ভাষার বিভিন্ন অংশে সংশোধনের পাশাপাশি কয়েকটি পুরোনো বিষয় বাদ দিয়ে নতুন বিষয় যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় ভারতীয় সংস্কৃতি, জাতীয় চেতনা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসকে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবগুলো এখন রাজ্য সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায়।
প্রস্তাবিত পরিবর্তনের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের পাঠ্যসূচিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আফ্রিকা’ কবিতার পরিবর্তে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শিবাজী উৎসব’ অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। একইভাবে শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাটকের বদলে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘মেবার পতন’ যুক্ত করার সুপারিশ করেছে কমিটি।
সিলেবাস কমিটির চেয়ারম্যান দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, পাঠ্যক্রমে ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বিষয়গুলোকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার লক্ষ্যেই এসব পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। তাঁর দাবি, মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস পাঠ্যসূচিতে প্রয়োজনীয় অংশটুকু রাখা হবে; তবে এ বিষয়ে আগের তুলনায় কম জায়গা দেওয়া হবে।
কমিটি কমিউনিজম সম্পর্কিত পাঠ্যাংশও সংক্ষিপ্ত করার সুপারিশ করেছে। চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে তথ্যভিত্তিক ও ঐতিহাসিক অংশ রাখা হবে, তবে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শকে ‘মহিমান্বিত’ করার সুযোগ রাখা হবে না। এর বিপরীতে স্বাধীনতা আন্দোলন ও স্বাধীনতাসংগ্রামীদের ভূমিকার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলা ভাষার ব্যবহারেও কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। পাঠ্যবইয়ে ব্যবহৃত ‘পানি’ শব্দের পরিবর্তে ‘জল’ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ‘আব্বা’ ও ‘আম্মু’র মতো শব্দ নিয়েও পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন সিলেবাস কমিটির চেয়ারম্যান।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের কিছু বিষয়ও নতুন পাঠ্যক্রমে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্প এবং সিঙ্গুর আন্দোলনের প্রসঙ্গ।
২০০৬ সালে সিঙ্গুরে টাটা মোটরসের প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আন্দোলনটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর কৃষকদের জমি ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০১৭ সালে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের পাঠ্যবইয়ে সিঙ্গুর আন্দোলনের বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গের স্কুলের বইগুলোতে বিজেপির আদর্শিক নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও অবদান অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তও জানানো হয়েছে। সিলেবাস কমিটির প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি পাঠ্যবইয়ে তাঁর জীবন ও অবদান নিয়ে লেখা রাখার কথা রয়েছে।
সিলেবাস কমিটির চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, সংশোধিত বইগুলো আগামী ২ জানুয়ারি থেকে শিক্ষার্থীদের হাতে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। তবে প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো নিয়ে শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন মহলে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, সেটিও এখন আলোচনার বিষয়।
নতুন পাঠ্যক্রম কার্যকর হলে পশ্চিমবঙ্গের স্কুলের ইতিহাস, সাহিত্য ও ভাষা শিক্ষায় দৃষ্টিভঙ্গির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে কোন বিষয় রাখা হচ্ছে, কোনটি বাদ দেওয়া হচ্ছে এবং নতুন বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে কী নীতি অনুসরণ করা হয়েছে—এসব নিয়ে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক ও শিক্ষামহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।